দেশে টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগায় অন্তত ৩০ লাখ শিশু এখন গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। নিয়মিত টিকা না পাওয়া কিংবা নির্ধারিত সময় মেনে টিকা গ্রহণ না করার কারণে এসব শিশু ১১টি প্রতিরোধযোগ্য রোগের মুখে পড়েছে বলে জানা গেছে।
ইতোমধ্যে দেশে হামের সংক্রমণ বেড়ে গেছে। পাশাপাশি পোলিও ও নবজাতকের ধনুষ্টংকারের মতো আগে নিয়ন্ত্রিত রোগ আবার ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত প্রায় দেড় বছরে টিকাদান কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। টিকা সংগ্রহে জটিলতা, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মবিরতির কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে অনেক শিশু নির্ধারিত সময়েও টিকা পায়নি।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩৪ লাখ শিশুর জন্ম হয়। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা এক বছরের জন্ম নেওয়া শিশুর সংখ্যার সমান বা তার চেয়েও বেশি হয়ে গেছে। বর্তমানে এই সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির হিসাব বলছে, ২০২৫ সালে টিকাগ্রহণের হার নেমে এসেছে ৫৯.৬০ শতাংশে। সেই বছর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রায় ১৬ লাখ ৬৮ হাজার শিশু টিকা পায়নি। এর আগে ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৮৬.৭ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে ছিল ৯৩.৬ শতাংশ।
ইপিআই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কিছু ক্ষেত্রে তথ্য হালনাগাদ না থাকায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য সহকারীদের বেতনসংক্রান্ত জটিলতার কারণে ডেটা আপডেটেও সমস্যা হয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে বর্তমানে হামের বড় প্রাদুর্ভাব চলছে। হাজার হাজার শিশু এতে আক্রান্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। যেসব শিশু টিকা পায়নি বা পূর্ণ ডোজ নেয়নি, তাদের মধ্যেই সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম নিয়ন্ত্রণে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা জরুরি।
এছাড়া নিয়ম অনুযায়ী প্রতি চার বছর পর একটি বড় টিকাদান ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও সেটি দীর্ঘদিন হয়নি। ফলে টিকাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে এবং সংক্রামক রোগ ছড়ানোর ঝুঁকিও বেড়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, টিকা কেনার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার ফলে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়। প্রকল্প অনুমোদন, অর্থ ছাড় এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হওয়ায় সময়মতো টিকা সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি জনবল সংকট ও সরঞ্জামের ঘাটতিও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
মাঠপর্যায়ে দেখা গেছে, কোথাও টিকা থাকলেও পর্যাপ্ত কর্মী নেই, আবার কোথাও কর্মী থাকলেও টিকার অভাব রয়েছে। দেশে প্রায় দেড় লাখ টিকাকেন্দ্র থাকলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক স্বাস্থ্য সহকারীর পদ এখনো শূন্য।
এদিকে টিকা ব্যবস্থাপনায় অপচয়ের ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একটি শিশুকে টিকা দিতে পুরো ভায়াল খুলতে হয়, যার বড় অংশই ব্যবহার না হয়ে নষ্ট হয়ে যায়। কিছু এলাকায় এই অপচয়ের হার খুব বেশি।
শুধু টিকা নয়, শিশুদের পুষ্টি সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন এ কার্যক্রমও নিয়মিতভাবে পরিচালিত হয়নি। গত দুই বছরে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ক্যাম্পেইন কম হওয়ায় শিশুদের ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত টিকা সরবরাহ স্বাভাবিক করা, পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করা এবং বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে টিকাবঞ্চিত শিশুদের আওতায় আনা এখন জরুরি। তা না হলে দেশের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে।