বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে ইতিবাচক গল্প এখন প্রায়ই সামনে আসে। সংসদ, প্রশাসন কিংবা করপোরেট খাতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে, যা নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। তবে এই দৃশ্যমান অগ্রগতি দেশের গ্রামীণ নারীদের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশের একটি বড় অংশ এখনো গ্রামনির্ভর। সেখানে নারীর ক্ষমতা নির্ধারিত হয় না কোনো পদ বা চাকরির মাধ্যমে। বরং পরিবারে তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভূমিকা, খাদ্য উৎপাদনে অংশগ্রহণ এবং সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণই নির্ধারণ করে তার প্রকৃত অবস্থান।
একসময় গ্রামীণ অর্থনীতির কেন্দ্র ছিল ধানভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি এবং পারিবারিক খাদ্য উৎপাদনের একটি সমন্বিত চক্র। এই পুরো ব্যবস্থার বড় অংশই নিয়ন্ত্রণ করতেন নারীরা। তারা ছোট পরিসরে উৎপাদন ও বিক্রির মাধ্যমে পরিবারে অর্থনৈতিক অবদান রাখতেন এবং একটি স্বনির্ভর কাঠামো তৈরি করতেন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কৃষিতে পরিবর্তন এসেছে। একক বাণিজ্যিক ফসলের দিকে ঝোঁক, বিশেষ করে ফলচাষের বিস্তার, গ্রামীণ অর্থনীতিকে নতুন পথে নিয়ে গেছে। অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হলেও এই পরিবর্তনে ধানভিত্তিক সেই পুরনো কাঠামো ভেঙে পড়ছে।
ফলে কমে যাচ্ছে খড়, তুষ ও অন্যান্য উপজাত। এর প্রভাব পড়ছে গবাদিপশু ও পোলট্রি খাতে। আর এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নারীরা, কারণ তাদের কাজের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। আয় কমার পাশাপাশি পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও কমছে।
এই পরিবর্তনের ফলে গ্রামীণ দারিদ্র্যের ধরনও বদলাচ্ছে। এটি শুধু আয়ের সংকটে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পুষ্টি, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক অবস্থানের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এই সংকটের মুখে সবচেয়ে বেশি পড়ছে।
নীতিগত দিক থেকেও একটি বড় ঘাটতি রয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নকে এখনও অনেকাংশে শহরকেন্দ্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে। ফলে গ্রামীণ নারীদের বাস্তব অবদান অদৃশ্য থেকে যাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে উন্নয়ন ভাবনাকে নতুনভাবে সাজানো জরুরি। ধান ও মিশ্র ফসলভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করা, কৃষিতে নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া, পশুপালন ও কুটিরশিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা সমাজের সব স্তরে সমানভাবে প্রভাব ফেলবে। নারীর ক্ষমতায়নকে কেবল শহুরে সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে গ্রামীণ বাস্তবতায় প্রতিষ্ঠা করাই এখন সময়ের দাবি।