মিয়ানমার আবারও বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় নিশ্চিত হওয়া ব্যক্তিদেরই ফেরত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক নতুন বিবৃতিতে এ অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।
শনিবার (১৫ আগস্ট) প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে বলা হয়, রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বাংলাদেশের আশ্রয়শিবিরে অবস্থানরত তিন লাখের বেশি যাচাই হওয়া বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিকে ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত রয়েছে মিয়ানমার। তবে বাংলাদেশ যে তালিকা দিয়েছে, তা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে দেশটি। পাশাপাশি তারা দাবি করেছে, ‘রোহিঙ্গা’ নামে কোনো জাতিগোষ্ঠী মিয়ানমারে নেই।
মিয়ানমারের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে আরসার হামলার পর নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের সময় বিপুলসংখ্যক ‘বাঙালি’ বাংলাদেশে পালিয়ে যায়। তাদের দাবি, ওই সময় প্রায় ৫ লাখ ৪০ হাজার মানুষ বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ফলে রাখাইন থেকে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এ তথ্য সঠিক নয় বলে উল্লেখ করেছে তারা।
বিবৃতিতে আরও জানানো হয়, বাংলাদেশের দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকার মধ্যে ২০২৬ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ৪ হাজার ২৪১ জনকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে দাবি করা হয়েছে এবং ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মিয়ানমার জানিয়েছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে যাচাই হওয়া ব্যক্তিদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি মিয়ানমারের পুরোনো অবস্থানেরই পুনরাবৃত্তি। একদিকে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, অন্যদিকে ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয় অস্বীকার করে আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম বলেন, অতীতেও তালিকা যাচাইয়ের নামে সময়ক্ষেপণ করেছে মিয়ানমার। এবারও একই কৌশল অনুসরণ করা হচ্ছে বলে তার ধারণা।
শরণার্থী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীরের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান নিয়ে চলমান আলোচনার পাল্টা বয়ান হিসেবেই মিয়ানমার এই বিবৃতি দিয়েছে। একই সঙ্গে ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয় অস্বীকারের অবস্থান আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠারও চেষ্টা করছে দেশটি।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযানের পর প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। আগে ও পরে আসা ব্যক্তিদের নিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ ৮৯ হাজার। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব এবং পরিচয়ের প্রশ্নে তা বাস্তবায়ন হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই বিবৃতি দীর্ঘদিন পর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুকে আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনায় নিয়ে এসেছে। তবে বাস্তবে প্রত্যাবাসন শুরু হবে কি না, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনার মতামত দিন।