মায়ানমারের সামরিক সরকার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক জোট আসিয়ানকে জানিয়েছে, দেশটির আটক সাবেক নেত্রী অং সান সু চি সুস্থ আছেন এবং তার যথাযথ দেখাশোনা করা হচ্ছে। তাকে ‘আমাদের বোন’ বলেও উল্লেখ করেছেন মায়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
আসিয়ানের বিশেষ দূত ও ফিলিপাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া তেরেসা লাজারো জানান, মায়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিন মং সোয়ে তাকে বলেছেন, “অং সান সু চি আমাদের আত্মীয়, তিনি আমাদের বোন। তাই আমরা তার যথাযথ যত্ন নিচ্ছি।”
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে তাকে আটক রাখা হয়েছে। ওই অভ্যুত্থানের পর দেশজুড়ে সংঘাত ও গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে।
সংবাদ সম্মেলনে লাজারো বলেন, মায়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে আশ্বস্ত করেছেন যে সু চি সুস্থ আছেন। তবে তার বর্তমান অবস্থান বা কোথায় রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
রোববার আসিয়ানভুক্ত ১১ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মায়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেন। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর এই প্রথম এমন বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল দেশটির চলমান সংঘাত নিরসন এবং শান্তি প্রচেষ্টা পুনরুজ্জীবিত করা।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের ধারণা, চলমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত প্রায় এক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এদিকে অং সান সু চি বর্তমানে ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। যদিও সম্প্রতি তার সাজা এক-তৃতীয়াংশ কমানো হয়েছে। তার সমর্থকদের দাবি, রাজনৈতিকভাবে তাকে নিষ্ক্রিয় রাখতেই এসব মামলা করা হয়েছে। তবে সু চি সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
মায়ানমারের সামরিক সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে আসিয়ান দীর্ঘদিন ধরে ‘পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। তবে এ পরিকল্পনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় দেশটির সামরিক নেতৃত্বকে আসিয়ানের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলোতে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয় না।
তবুও মারিয়া তেরেসা লাজারো মনে করেন, সংলাপ চালিয়ে যাওয়া জরুরি। তার ভাষায়, “এই সংকট একদিনে সমাধান হবে না। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
অন্যদিকে, গত সপ্তাহে মায়ানমারের সামরিকপন্থী সংসদ আসিয়ানের শান্তি উদ্যোগকে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে আখ্যা দিয়ে একটি প্রস্তাব পাস করে। তারা সেনাসমর্থিত নতুন বেসামরিক সরকারকে এই উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করার আহ্বানও জানায়।
তবে আসিয়ান তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। লাজারো বলেন, পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা সংঘাতে জড়িত পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপ বাড়ানো এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি কাঠামো।
এদিকে থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিহাসাক ফুয়াংকেটকেউন জানান, আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মায়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে তাদের প্রত্যাশার কথা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা অং সান সু চির সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ চেয়েছেন, যাতে তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে সরাসরি নিশ্চিত হওয়া যায়।
মায়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৈঠকে দুই পক্ষের সম্পর্ক জোরদার করা এবং আসিয়ানের কার্যক্রমে মায়ানমারের পূর্ণ ও সমান অংশগ্রহণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি অং সান সু চির সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে।
তবে সমালোচকদের মতে, যারা আসিয়ানের শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আগ্রহী নয়, তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করা কঠিন। তা সত্ত্বেও আসিয়ান তাদের শান্তি উদ্যোগ অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনার মতামত দিন।