দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার এক বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে খেলার মাঠের অভাব। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালায় মাঠ বাধ্যতামূলক থাকলেও ঢাকাসহ সারা দেশের ১৫ হাজারের বেশি সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেই নিজস্ব খেলার মাঠ। ফলে লাখো শিক্ষার্থী শারীরিক ব্যায়াম, খেলাধুলা এবং সহশিক্ষা কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকায় পাঁচ হাজারের বেশি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশই বেসরকারি এবং প্রায় ৯৮ শতাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব খেলার মাঠ নেই। অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে ভবনের গ্যারেজ, ছাদ কিংবা সীমিত জায়গায়, যেখানে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার সুযোগ নেই বললেই চলে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, রাজধানীর ৩৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৫২টিতে কোনো খেলার মাঠ নেই। একইভাবে দেশের অর্ধেকের বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৭২ দশমিক ২৬ শতাংশ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলেও শিক্ষার্থীরা মাঠ সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
শিক্ষাবিদদের মতে, খেলাধুলা শুধু বিনোদনের বিষয় নয়; এটি শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও সৃজনশীল বিকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য পাঠদানের পাশাপাশি খেলাধুলার উপযুক্ত পরিবেশও অপরিহার্য। মাঠ না থাকলে শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা তাদের স্বাস্থ্য ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্রীড়া ও শরীরচর্চার সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও নির্দেশ দিয়েছে, শিক্ষা কার্যক্রম শেষে এবং ছুটির দিনে স্কুলের মাঠ স্থানীয় শিশু-কিশোরদের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। তবে বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠান এই নির্দেশনা অনুসরণ করছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাঠের অভাবে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ অবসর সময় কাটাচ্ছে রেস্টুরেন্ট, ফাস্টফুডের দোকান কিংবা মোবাইল ফোনের পর্দায়। এর ফলে স্থূলতা, চোখের সমস্যা, ঘুমের ব্যাঘাত এবং মানসিক চাপের মতো নানা সমস্যা বাড়ছে।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার আয়তন অনুযায়ী অন্তত ৬১০টি খেলার মাঠ প্রয়োজন হলেও বাস্তবে রয়েছে মাত্র ২৩৫টি। অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী জনপ্রতি ৯ বর্গমিটার খোলা জায়গা প্রয়োজন হলেও ঢাকা শহরে তা ১ বর্গমিটারেরও কম।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, দেশের প্রায় ৬৬ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মানের খেলার মাঠ বাধ্যতামূলক করার বিষয়েও কাজ চলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আবদুল হালিম বলেন, শিক্ষার্থীদের সুস্থ শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করতে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলার মাঠ থাকা অত্যন্ত জরুরি। এ বিষয়ে কার্যকর সরকারি পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
শিক্ষাবিদদের মতে, পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি খেলাধুলা ও উন্মুক্ত পরিবেশও একজন শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য অপরিহার্য। তাই খেলার মাঠের সংকট দূর করা এখন জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হয়ে উঠেছে।
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনার মতামত দিন।