মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন এক মোড়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাম্প্রতিক অবস্থান। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা, সৌদি আরবের সঙ্গে নীতিগত দূরত্ব এবং ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে দেশটি এখন আঞ্চলিক বলয়ের বাইরে নিজেদের আলাদা অবস্থান গড়ে তুলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গত ৪ থেকে ১০ মে পর্যন্ত দফায় দফায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পড়ে আমিরাত। ফুজাইরাহর তেল শোধনাগারসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থাপনায় হামলার ঘটনা দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় আনে। যদিও ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে দায় স্বীকার করেনি, তবে হামলার সময়কাল এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র যখন ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’-এর আওতায় হরমুজ প্রণালিতে নতুন নৌ-অভিযান শুরু করে, ঠিক তখনই এই হামলার ঘটনা ঘটে। পরে যুক্তরাষ্ট্র অভিযান স্থগিত করলেও ইরান ও মার্কিন বাহিনীর উত্তেজনা অব্যাহত থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ইরানের কেশম দ্বীপ ও বন্দর আব্বাস এলাকায় মার্কিন হামলার পর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় আমিরাতকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি আমিরাতকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে আঞ্চলিক জোটের ওপর নির্ভর করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে রিয়াদের অবস্থান আবুধাবিকে পুরোপুরি আশ্বস্ত করতে পারেনি।
এর মধ্যেই ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে বড় ধরনের কূটনৈতিক বার্তা দিয়েছে আমিরাত। প্রায় ছয় দশক ধরে জোটটির অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য ছিল দেশটি। এখন তারা তেল উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কৌশলে আরও স্বাধীনভাবে এগোতে চাইছে।
১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর থেকেই আমিরাতকে সৌদি আরবের প্রভাব বলয়ের ভেতর থেকেই নিজেদের কৌশল নির্ধারণ করতে হয়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আবুধাবি বুঝতে পারে, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করা জরুরি।
বিশেষ করে আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একসময় নতুন সমীকরণ তৈরি করেছিল। ইয়েমেন যুদ্ধ, কাতার অবরোধ এবং ইরানবিরোধী অবস্থানে দুই দেশ একসঙ্গে থাকলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের দূরত্ব বাড়তে থাকে।
ইসরায়েলের সঙ্গে আমিরাতের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সিদ্ধান্তও এই দূরত্বের বড় কারণগুলোর একটি। ২০২০ সালে আব্রাহাম অ্যাকর্ড স্বাক্ষরের মাধ্যমে আমিরাত নতুন কৌশলগত জোটে যুক্ত হয়। তবে ফিলিস্তিন ইস্যুর কারণে সৌদি আরব সেই পথে এগোয়নি।
এর পর থেকেই ইরানের সঙ্গে আমিরাতের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে ওঠে। তেহরান প্রকাশ্যে আমিরাতকে সতর্ক করে এবং দেশটিকে সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উল্লেখ করে। সাম্প্রতিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সেই উত্তেজনাকেই নতুন মাত্রা দিয়েছে।
অন্যদিকে যুদ্ধ ও নিরাপত্তা সংকটের প্রভাব পড়েছে আমিরাতের অর্থনীতিতেও। দুবাইয়ের পর্যটন খাত বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। একই সময়ে ইয়েমেন, সুদান ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে সৌদি ও আমিরাতের স্বার্থের সংঘাতও প্রকাশ্যে এসেছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এসব কারণ মিলিয়েই এখন ‘স্ট্র্যাটেজিক ব্রেকআউট’ বা স্বাধীন কৌশলগত অবস্থানের পথে হাঁটছে আমিরাত। ওপেক ছাড়ার সিদ্ধান্তকে সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনার মতামত দিন।