রুশ হামলায় পুড়ল ৮০ লাখ বই, সংকটে ইউক্রেনের প্রকাশনা শিল্প
ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর খারকিভে রুশ ড্রোন হামলায় প্রায় ৮০ লাখ বই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঘটনায় দেশটির প্রকাশনা শিল্প বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। শিশুদের গল্পের বই, স্কুলের পাঠ্যবইসহ বিপুল পরিমাণ বই মজুত ছিল একটি গুদামে, যা মুহূর্তেই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
গুদামটির মালিক ইউক্রেনের অন্যতম বৃহৎ শিশুতোষ বই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘রানক’। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ভিক্টর ক্রুহলোভ বলেন, নিজের প্রকাশিত লাখ লাখ বই আগুনে পুড়ে যেতে দেখা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তার ভাষায়, “বই পুড়তে দেখা সত্যিই ভয়ংকর একটি দৃশ্য।”
গত ১ আগস্ট খারকিভে রানকের গুদামে এই হামলা হয়। প্রকাশকদের মতে, চার বছর ধরে চলা যুদ্ধের মধ্যে ইউক্রেনের প্রকাশনা শিল্পে এটিই সবচেয়ে বড় ধ্বংসযজ্ঞ। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে গুদাম ও ছাপাখানায় হামলার কারণে ১ কোটিরও বেশি বই নষ্ট হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
ক্রুহলোভ জানান, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার সময় প্রথম বিস্ফোরণের কিছুক্ষণ পর একই স্থানে দ্বিতীয় বিস্ফোরণ ঘটে। তার অভিযোগ, বইয়ের গুদামটি ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। রানক প্রতিষ্ঠানটি ইউক্রেনের স্কুলগুলোতে ব্যবহৃত প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পাঠ্যবই সরবরাহ করে। ফলে এই ক্ষতির প্রভাব শিক্ষা খাতেও পড়বে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ইউক্রেনের অনেক নাগরিক এই যুদ্ধকে শুধু ভূখণ্ড নয়, বরং ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয় রক্ষার লড়াই হিসেবে দেখেন। দেশটির শিক্ষামন্ত্রী আন্দ্রি বুতেঙ্কো বলেন, বইয়ের গুদাম ও ছাপাখানায় হামলার লক্ষ্য ইউক্রেনীয় ভাষা, ইতিহাস এবং জনগণের স্মৃতিকে আঘাত করা।
অর্থনৈতিক ক্ষতিও কম নয়। কিয়েভভিত্তিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বুকশেফের প্রধান সম্পাদক ইয়েভহেন শিরিনোস জানান, গত জুলাইয়ে রুশ হামলায় তাদের প্রায় ৮ লাখ বই ধ্বংস হয়। পরে আরেকটি বিকল্প গুদামেও হামলায় আরও প্রায় ১ লাখ বই নষ্ট হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে ইউক্রেনের অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে। অবকাঠামো, সরবরাহব্যবস্থা ও উৎপাদন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও কমিয়ে আনা হয়েছে।
অন্যদিকে প্রতিরক্ষা শিল্প ছাড়া অর্থনীতির অনেক খাতই স্থবির হয়ে পড়েছে। কৃষি খাতেও বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের বন্দর অবকাঠামোতে হামলার কারণে কৃষি রপ্তানি আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
প্রকাশকদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে, কারণ একটি বই বাজারে আনতে ছয় মাস থেকে দেড় বছর পর্যন্ত সময় লাগে। ফলে ধ্বংস হওয়া বিপুল সংখ্যক বই দ্রুত পুনরায় সরবরাহ করা সম্ভব নয়।
যুদ্ধ শুরুর পর ইউক্রেনীয় ভাষার বইয়ের চাহিদা বাড়লেও বর্তমানে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস এবং গুদামে হামলার কারণে প্রকাশনা শিল্প নতুন সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে। প্রকাশকদের আশঙ্কা, যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে এই খাতের পুনরুদ্ধার আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনার মতামত দিন।