বিশ্বকাপ মানেই ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর। তবে ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছিল ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপের আগে। প্রতিযোগিতা শুরুর কয়েক মাস আগে রহস্যজনকভাবে চুরি হয়ে যায় সেই সময়ের বিশ্বকাপ ট্রফি জুলে রিমে ট্রফি। আর সেটি উদ্ধার করে কোনো গোয়েন্দা বা নিরাপত্তা বাহিনী নয়, একটি পোষা কুকুর।
১৯৬৬ সালের ২০ মার্চ লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টারের মেথডিস্ট সেন্ট্রাল হলে একটি প্রদর্শনীতে রাখা হয়েছিল জুলে রিমে ট্রফি। বিশ্বকাপের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে হাজারো দর্শনার্থীর জন্য প্রদর্শন করা হচ্ছিল ফুটবলের সবচেয়ে মূল্যবান এই স্মারক।
কিন্তু কড়া নিরাপত্তার মধ্যেও একপর্যায়ে ট্রফিটি উধাও হয়ে যায়। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর পুরো ইংল্যান্ডে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ হিসেবে এটি ছিল বড় ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতি।
চুরির পরপরই পুলিশ তদন্ত শুরু করে। সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। পরদিন ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তা জো মিয়ার্সের কাছে মুক্তিপণের দাবিও আসে। ট্রফি ফেরত দেওয়ার বিনিময়ে ১৫ হাজার পাউন্ড দাবি করা হয়। প্রমাণ হিসেবে ট্রফির একটি অংশও পাঠানো হয়েছিল।
ঘটনার তদন্তে এডওয়ার্ড বেচলি নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হলেও ট্রফির কোনো খোঁজ মেলেনি। ফলে রহস্য আরও গভীর হতে থাকে।
ঠিক এক সপ্তাহ পর নাটকীয় মোড় নেয় পুরো ঘটনা।
২৭ মার্চ দক্ষিণ লন্ডনের বিউলা হিল এলাকায় ডেভিড করবেট তার পোষা কুকুর পিকলসকে নিয়ে হাঁটতে বের হন। হাঁটার সময় একটি ঝোপের নিচে পড়ে থাকা সংবাদপত্রে মোড়ানো একটি প্যাকেটের গন্ধ পায় পিকলস। কৌতূহলী কুকুরটির আচরণ দেখে প্যাকেটটি খুলে দেখেন করবেট।
ভেতরে থাকা বস্তুটি দেখে তিনি বিস্মিত হয়ে যান। সেটি ছিল হারিয়ে যাওয়া জুলে রিমে ট্রফি।
ট্রফির নিচে বিজয়ীদের নাম খোদাই করা ছিল। সেখান থেকেই নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি বিশ্বকাপের সেই বহুল আলোচিত ট্রফি।
ঘটনার পর প্রথমদিকে পুলিশ করবেটকেও সন্দেহের তালিকায় রেখেছিল। তবে তদন্তে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ায় সন্দেহ দূর হয়। অন্যদিকে রাতারাতি তারকাখ্যাতি পেয়ে যায় পিকলস।
সংবাদপত্র, টেলিভিশন অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন পুরস্কার অনুষ্ঠানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে এই কুকুর। এমনকি তার জন্য বিশেষ পুরস্কারের ব্যবস্থাও করা হয়।
মজার বিষয় হলো, সেই বছরই বিশ্বকাপের শিরোপা জেতে ইংল্যান্ড। ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে নিজেদের ইতিহাসের একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পায় তারা।
জুলে রিমে ট্রফির ইতিহাসও কম নাটকীয় নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ট্রফিটি গোপনে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। পরে ১৯৭০ সালে তৃতীয়বার বিশ্বকাপ জেতার পুরস্কার হিসেবে ট্রফিটি স্থায়ীভাবে ব্রাজিলকে দেওয়া হয়।
তবে সেখানেও শেষ হয়নি নাটক। ১৯৮৩ সালে ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের সদর দপ্তর থেকে আবারও চুরি হয়ে যায় ট্রফিটি। এবার আর সেটি কখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
ফুটবল ইতিহাসে অসংখ্য স্মরণীয় ম্যাচ রয়েছে, রয়েছে অসংখ্য কিংবদন্তির গল্প। তবে হারিয়ে যাওয়া বিশ্বকাপ ট্রফি খুঁজে পাওয়ার এই ঘটনাটি আজও সবচেয়ে অবিশ্বাস্য অধ্যায়গুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।
একদিকে চোরের পরিকল্পনা, অন্যদিকে একটি কুকুরের স্বাভাবিক কৌতূহল। আর সেই কৌতূহলই ফিরিয়ে দিয়েছিল ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান প্রতীককে।
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনার মতামত দিন।