মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা সরকারি প্রিন্টিং প্রেস থেকেই দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সম্প্রতি আদালতে জমা দেওয়া চার্জশিটে উঠে এসেছে ২০০৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পরিচালিত একটি সুসংগঠিত প্রশ্নফাঁস চক্রের বিস্তৃত তথ্য।
মামলার তদন্তে সিআইডি বলছে, স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর প্রিন্টিং প্রেসে কর্মরত এক মেশিনম্যান প্রশ্নপত্র ছাপানোর বিভিন্ন ধাপে গোপনে প্রশ্ন সরিয়ে চক্রের সদস্যদের কাছে পৌঁছে দিতেন। পরে সেই প্রশ্ন মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ভর্তি পরীক্ষার্থীদের কাছে বিক্রি করা হতো।
এ ঘটনায় ২০২০ সালের ২০ জুলাই মিরপুর মডেল থানায় মামলা দায়ের করা হয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। একইসঙ্গে পর্যাপ্ত প্রমাণ না পাওয়ায় ২১ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
তদন্তে জানা যায়, প্রশ্নপত্র সংগ্রহের পর একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সেগুলো পরীক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো। চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন কোচিং সেন্টার ও পরিচিত মাধ্যম ব্যবহার করে সম্ভাব্য ক্রেতা খুঁজতেন। পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে আগাম লাখ লাখ টাকার চেক, জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি ও অন্যান্য তথ্য সংগ্রহ করা হতো।
সিআইডির তথ্যমতে, পরীক্ষার আগের রাতে বিশেষ ব্যবস্থায় প্রশ্ন ও উত্তর সরবরাহ করা হতো। অনেক ক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ৭ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সুবিধা নিয়ে মেডিকেলে ভর্তি হওয়া কয়েকজন পরবর্তীতে নিজেরাই প্রশ্নফাঁস চক্রের অংশ হয়ে ওঠেন। কেউ পরীক্ষার্থী সংগ্রহ করেছেন, কেউ প্রশ্ন বিতরণে যুক্ত ছিলেন, আবার কেউ উত্তর তৈরির দায়িত্ব পালন করেছেন।
তদন্ত সংস্থা বলছে, এ চক্র শুধু ভর্তি প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেনি, বরং দেশের চিকিৎসা শিক্ষা ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। মেধার পরিবর্তে অর্থের বিনিময়ে ভর্তি নিশ্চিত করে তারা দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ সুবিধা আদায় করেছে।
চার্জশিটে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রশ্নফাঁসের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয় চক্রটি। তদন্তে কয়েকজন অভিযুক্তের ব্যাংক হিসাব, সঞ্চয়পত্র ও এফডিআরে কোটি কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। কয়েকজনের হিসাবে ২০ কোটিরও বেশি টাকা জমার প্রমাণ মিলেছে বলে জানিয়েছে সিআইডি।
মামলাটি এখন বিচারিক প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনার মতামত দিন।