দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ বাড়তে থাকায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে অল্প বয়সী শিশুদের নিয়ে। যেসব শিশুর এখনও হাম প্রতিরোধী টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি, তাদের মধ্যেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে রোগটি। রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এখন প্রতিদিনই বাড়ছে এমন রোগীর সংখ্যা।
মাত্র তিন মাস ১২ দিন বয়সী রাফাতকে কয়েকদিন আগে হাসপাতালে ভর্তি করান তার পরিবার। জ্বর, পাতলা পায়খানা ও শরীরে লালচে দাগ দেখা দেওয়ার পর চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেন, শিশুটি হামে আক্রান্ত। কিন্তু বয়স কম হওয়ায় এখনো তার এমআর টিকা নেওয়ার সুযোগই হয়নি।
শয্যা সংকটে হাসপাতালের মেঝেতেই চলছে তার চিকিৎসা। শিশুটির মা ফাতেমা আক্তার বলেন, এত ছোট বাচ্চা শুধু বুকের দুধ খায়। কয়েকদিন ধরেই অসুস্থ ছিল। পরে শরীরে দাগ ওঠার পর হাসপাতালে আনি। ডাক্তার জানান, হাম হয়েছে। এখন কীভাবে বাচ্চাকে বাঁচাব, বুঝতে পারছি না।
একই ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন সাত মাস বয়সী শাফায়েতও ভুগছে জ্বর ও শ্বাসকষ্টে। তার মায়ের অভিযোগ, প্রয়োজনের সময় অক্সিজেন ও সেবাসুবিধা ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েকদিন ধরেই শিশুটির অবস্থা গুরুতর।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, বর্তমানে ভর্তি হওয়া হাম আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৭০ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম। অর্থাৎ তারা নিয়মিত টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছায়নি। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত এক হাজারের বেশি শিশুকে হামজনিত জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। মারা গেছে অন্তত ৪৫ শিশু।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এফ এ আসমা খান জানান, কম বয়সী শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ হতে পারে মাতৃ অপুষ্টি। গর্ভকালীন সময়ে পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাব শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল করে দিচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে দুটি সংস্থা গবেষণা শুরু করেছে।
তিনি বলেন, সরকার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরুর পর রোগীর চাপ কিছুটা কমতে শুরু করেছে। আগে প্রতিদিন বহির্বিভাগে গড়ে ৩০ জন শিশু এলেও এখন তা কমে প্রায় অর্ধেকে নেমেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হাম ও হাম সন্দেহে আরও ১ হাজার ৬১৫ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। একই সময়ে মারা গেছে ৮ শিশু। এ পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৬০ হাজার ছাড়িয়েছে এবং মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৩২ জনে।
স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, কয়েক বছর ধরে নিয়মিত হামবিরোধী ক্যাম্পেইন না হওয়া এবং টিকাদান কভারেজে দুর্বলতার কারণে বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে মা ও শিশুদের অপুষ্টিও বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে।
তিনি জানান, বর্তমানে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম শুধু সাধারণ ভাইরাসজনিত রোগ নয়। এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা, খিঁচুনি এমনকি মৃত্যুর মতো জটিলতাও তৈরি করতে পারে। তাই শিশুদের জ্বর, শ্বাসকষ্ট, খেতে না পারা বা অতিরিক্ত দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনার মতামত দিন।