আজ ১ জুলাই। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। ২০২৪ সালের এই দিনে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, সেটিই পরবর্তীতে ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ধারাবাহিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ৫ আগস্ট তৎকালীন সরকারের পতনের ঘটনা ঘটে। সেই আন্দোলনের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির আনুষ্ঠানিক সূচনা হলো আজ।
২০২৪ সালের ১ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কর্মসূচি শুরু করেন। শুরুতে আন্দোলন ছিল শান্তিপূর্ণ। তবে সময়ের সঙ্গে তা আরও বিস্তৃত হয় এবং জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে সংঘাত ও প্রাণহানির ঘটনা আন্দোলনের গতিপথ পাল্টে দেয়। পরবর্তীতে আন্দোলন শুধু কোটা সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ না থেকে সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে পরিণত হয়।
এই আন্দোলনের পেছনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয় ২০১৮ সালে। সে সময় সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে দেশজুড়ে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন গড়ে তোলেন। ধারাবাহিক কর্মসূচির মুখে সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়।
তবে ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট ওই পরিপত্র বাতিল ঘোষণা করলে মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ বিভিন্ন কোটা পুনর্বহাল হয়। আদালতের এই সিদ্ধান্তের পর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবারও আন্দোলন শুরু হয়। শিক্ষার্থীরা নতুন নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কোটা বাতিলের দাবি জানান।
জুনজুড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। একই সময়ে সরকার সুপ্রিম কোর্টে আপিল করলেও শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হয়। পরে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে টিএসসির রাজু ভাস্কর্যে সমাবেশ করেন। সেখান থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে পদযাত্রা, বিক্ষোভ ও সমাবেশসহ ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
সমাবেশে আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ৪ জুলাইয়ের মধ্যে দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম, আবাসন ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করার দাবিও তোলা হয়।
একই দিনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল করেন। পরে তারা ঢাকা আরিচা মহাসড়কে প্রতীকী অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন এবং দাবি পূরণ না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও একই দাবিতে মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
আন্দোলনকারীদের মূল দাবির মধ্যে ছিল ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের পরিপত্র পুনর্বহাল, সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটাব্যবস্থার সংস্কার এবং ভবিষ্যতে কোটাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন।
পরবর্তীতে এই আন্দোলনই দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় গণআন্দোলনে রূপ নেয় এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করে।
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনার মতামত দিন।