সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগকে প্রয়োজনীয় বললেও এর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, বেতন বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের দাম, আয় বৈষম্য এবং ব্যাংক খাতের তারল্যের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যদি সরকার কার্যকর প্রস্তুতি না নেয়।
ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা ও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী মোহাম্মদ শিহাব উদ্দিন বলেন, বর্তমান বাজারে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। তার আশঙ্কা, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে, অথচ বেসরকারি খাতের কর্মীদের আয় একই থাকবে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় আসতে পারেন। তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লে বাজারে পণ্যের চাহিদাও বৃদ্ধি পাবে। সরবরাহ ব্যবস্থাপনা দুর্বল হলে এর প্রভাব সরাসরি মূল্যস্ফীতিতে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর বলেন, দীর্ঘদিন নতুন পে স্কেল না হওয়ায় এটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। তবে বাস্তবায়নের আগে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বাজার তদারকি এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হানের মতে, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে। সেই অর্থ ঋণ বা নতুন অর্থ সরবরাহের মাধ্যমে এলে মুদ্রাস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে।
কী পরিবর্তন আসতে পারে
২০১৫ সালের পর বাংলাদেশে আর নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণা হয়নি। এরপর প্রতি বছর নির্ধারিত হারে ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হলেও নতুন পে স্কেল কার্যকর হয়নি।
২০২৫ সালে গঠিত বেতন কমিশন সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করে। কমিশনের প্রস্তাবে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি বৈশাখী ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
বর্তমান সরকার আগের সুপারিশ পর্যালোচনা করে নতুন একটি খসড়া প্রস্তুত করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন তুলনামূলক বেশি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে মূল বেতন প্রায় দ্বিগুণ পর্যন্ত হতে পারে।
বাড়তে পারে মূল্যস্ফীতি ও বাজারদর
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়লে তাদের ভোগ ব্যয়ও বাড়বে। এর ফলে বাজারে নিত্যপণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে। সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকলে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।
ড. মাহফুজ কবীরের মতে, অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, চাহিদা বাড়লেই বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর নজরদারি জরুরি।
বৈষম্য বাড়ার আশঙ্কা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ কর্মজীবী মানুষ বেসরকারি খাতে কাজ করেন। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লেও বেসরকারি খাতে একই ধরনের সমন্বয় না হলে আয় বৈষম্য আরও বাড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে দারিদ্র্যের হারও বেড়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু সরকারি খাতে বেতন বৃদ্ধি হলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত বেসরকারি কর্মীদের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
সরকারের অবস্থান
সরকার বলছে, দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। তবে অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ এড়াতে এটি ধাপে ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম ধাপে মূল বেতন বৃদ্ধি এবং পরবর্তী ধাপগুলোতে অন্যান্য ভাতা কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের আশা, ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করলে সরকারি কর্মচারীরা স্বস্তি পাবেন এবং একই সঙ্গে অর্থনীতির ওপর চাপও তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনার মতামত দিন।