মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণকে সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রস্তুত করেছে সরকার। আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বর্তমান সরকারের মেয়াদে এটি প্রথম জাতীয় বাজেট।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত বাজেটের আকার প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা হতে পারে, যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট। একই সঙ্গে আগামী অর্থবছরে জিডিপির আকার ৬৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি কমানোই বড় লক্ষ্য
দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে তুলেছে। মে মাসে মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছানোর পর নতুন বাজেটে তা কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পারলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ফল পাওয়া যেতে পারে।
সামাজিক সুরক্ষায় বাড়তি গুরুত্ব
নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের সহায়তায় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচিসহ বিভিন্ন কল্যাণমূলক খাতে বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এছাড়া নতুন অর্থবছরে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের জন্য ই হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে, যার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে উদ্যোগ
বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে কয়েকটি বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা সহায়তা তহবিলের পাশাপাশি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচিও জোরদার করা হবে।
ব্যবসা সহজ করতে ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি সমন্বিত ডিজিটাল সেবা প্ল্যাটফর্ম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন অনুমোদন ও সেবা এক জায়গা থেকেই পাওয়া যাবে।
রাজস্ব আদায়ে বড় লক্ষ্য
আগামী অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ সংগ্রহ করবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
কর ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও স্বচ্ছ করতে অনলাইনে রিটার্ন দাখিল, দ্রুত কর ফেরত প্রদান এবং কর সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থায় নতুন উদ্যোগ আসতে পারে।
ভর্তুকি ও ঋণের চাপ
জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও সার খাতে ভর্তুকির চাপ অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি ঋণের সুদ পরিশোধ এবং উন্নয়ন প্রকল্পের দায়ও বাড়ছে। ফলে প্রস্তাবিত বাজেটে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি থাকতে পারে।
এই ঘাটতি মোকাবিলায় সরকার ব্যাংক ঋণ, ব্যাংকবহির্ভূত উৎস এবং বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভর করবে বলে জানা গেছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সম্ভাবনা
বাজেটে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন নিয়ে আংশিক ঘোষণা আসতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বকর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে বিভিন্ন কর্মসূচিরও ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের বাজেটের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনার মতামত দিন।