বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্রাজিল মানেই আলাদা এক আবহ। পাঁচটি শিরোপা, অসংখ্য তারকা আর ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য দলটিকে সবসময়ই প্রতিপক্ষের জন্য বিশেষ চ্যালেঞ্জ বানিয়ে রাখে। কিন্তু মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের পর একটি প্রশ্ন জোরালোভাবে সামনে এসেছে, এই ব্রাজিলকে দেখে কি সত্যিই ভয় পাবে অন্য শিরোপাপ্রত্যাশী দলগুলো?
গ্রুপ ‘সি’তে নিজেদের প্রথম ম্যাচে ১-১ গোলে ড্র করেছে ব্রাজিল। ফলাফল যতটা না আলোচনায়, তার চেয়ে বেশি আলোচনায় দলের পারফরম্যান্স। দীর্ঘ সময় মাঠে মনে হয়েছে মরক্কোই বেশি সংগঠিত, বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং পরিকল্পনায় এগিয়ে।
শুরু থেকেই অস্বস্তিতে ব্রাজিল
ম্যাচের শুরুতে বলের নিয়ন্ত্রণ এবং ছন্দ দুই ক্ষেত্রেই পিছিয়ে ছিল ব্রাজিল। মরক্কো রক্ষণে গুটিয়ে না থেকে উল্টো মাঝমাঠে চাপ তৈরি করেছে এবং দ্রুত আক্রমণে উঠেছে।
এই পরিকল্পনার ফল আসে ২১ মিনিটে। ব্রাহিম দিয়াসের চমৎকার থ্রু পাস থেকে গোল করেন ইসমাইল সাইবারি। গোলটি শুধু স্কোরলাইন বদলায়নি, ম্যাচে মরক্কোর আত্মবিশ্বাসও আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে ব্রাজিল তখন নিজেদের ছন্দ খুঁজতেই ব্যস্ত। মাঝমাঠে কাসেমিরো, ব্রুনো গিমারায়েস ও লুকাস পাকেতা প্রত্যাশিত নিয়ন্ত্রণ দিতে পারেননি। ডান দিকেও বারবার সমস্যায় পড়েছে আনচেলত্তির দল।
ভিনিসিয়ুসের ঝলকেই টিকে থাকা
প্রথমার্ধে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক ছিল ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। ৩১ মিনিটে ব্যক্তিগত দক্ষতায় করা তাঁর গোলই দলকে ম্যাচে ফেরায়।
তবে উদ্বেগের জায়গাও এখানেই। ব্রাজিলের সমতা ফেরানোর মুহূর্তটি ছিল ব্যক্তিগত প্রতিভার ফল, দলগত আক্রমণের নয়।
রাফিনিয়া, ইগর থিয়াগো কিংবা পরে নামা মাতেউস কুনিয়ারা আক্রমণে তেমন প্রভাব ফেলতে পারেননি। ফলে ভিনিসিয়ুসের ওপর নির্ভরশীলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মাঝমাঠে কি পরিবর্তনের সময় এসেছে?
মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচে সবচেয়ে বেশি নজরে এসেছে ব্রাজিলের মাঝমাঠের দুর্বলতা। অভিজ্ঞ কাসেমিরো পুরো ম্যাচে স্বাচ্ছন্দ্যে ছিলেন না। প্রতিপক্ষের দ্রুত গতির ফুটবলের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে একাধিকবার সমস্যায় পড়েন তিনি।
প্রথমার্ধ শেষে তাঁকে তুলে নেওয়া হয়, যা কোচের অসন্তুষ্টিরই ইঙ্গিত দেয়।
এখন প্রশ্ন উঠছে, ব্রাজিল কি ধীরে ধীরে নতুন প্রজন্মের মিডফিল্ডারদের দিকে ঝুঁকবে? নাকি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে এখনও কাসেমিরোর অভিজ্ঞতার ওপরই ভরসা রাখবে?
মরক্কো আর আন্ডারডগ নয়
একসময় মরক্কোর ভালো পারফরম্যান্সকে চমক বলা হতো। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে।
২০২২ বিশ্বকাপের সাফল্যের পর দলটি আরও পরিণত হয়েছে। ব্রাজিলের বিপক্ষেও তারা ভয়হীন ফুটবল খেলেছে। বিশেষ করে তরুণ মিডফিল্ডার আয়ুব বুয়াদির পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো।
পুরো ম্যাচে মরক্কোর খেলোয়াড়দের শরীরী ভাষা বলছিল, তারা শুধু ড্র করতে আসেনি, জয়ের জন্যও বিশ্বাস নিয়ে মাঠে নেমেছিল।
আনচেলত্তির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
কার্লো আনচেলত্তি এখনও নিজের পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেননি বলেই মনে হচ্ছে। ব্রাজিল কি বলের নিয়ন্ত্রণভিত্তিক ফুটবল খেলবে, নাকি দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকে ভর করবে, সেটি এখনও পরিষ্কার নয়।
রাইটব্যাক পজিশনের সমাধান, মাঝমাঠের ভারসাম্য এবং আক্রমণে কার্যকর সমন্বয় এখন তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বকাপে একটি ড্র কখনও কোনো দলের ভাগ্য নির্ধারণ করে না। ব্রাজিলের সামনে এখনও ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে।
বর্তমান ব্রাজিল দলে প্রতিভার অভাব নেই। কিন্তু শুধু তারকা ফুটবলার থাকলেই প্রতিপক্ষ ভয় পায় না। ভয় তৈরি হয় যখন একটি দল মাঠে নিজেদের শক্তি, নিয়ন্ত্রণ ও ধারাবাহিকতা দেখাতে পারে।
প্রথম ম্যাচে ভিনিসিয়ুস ব্রাজিলকে হার থেকে বাঁচিয়েছেন। কিন্তু বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে হলে আনচেলত্তির দলকে আরও অনেক বেশি পরিণত, ভারসাম্যপূর্ণ এবং ভয়ঙ্কর রূপে ফিরতে হবে। তখনই হয়তো প্রতিপক্ষরা আবার সেই চেনা ব্রাজিলকে দেখে শঙ্কিত হবে।
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনার মতামত দিন।