বরিশাল অঞ্চলে শিশু ও কিশোরদের মধ্যে চোখের সমস্যা দ্রুত বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। তাদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অতিরিক্ত সময় স্মার্টফোন ব্যবহারের কারণে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু মায়োপিয়া বা স্বল্পদৃষ্টির সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ শিশু ও কিশোর দৃষ্টিশক্তি সংক্রান্ত জটিলতায় ভুগছে। এর পেছনে দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোন, ট্যাব কিংবা অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের প্রবণতাকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মায়োপিয়া এমন একটি সমস্যা, যেখানে কাছের বস্তু স্পষ্ট দেখা গেলেও দূরের জিনিস ঝাপসা লাগে। একসময় এটি তুলনামূলক কম বয়সে কম দেখা গেলেও বর্তমানে শিশুদের মধ্যেই এ রোগের হার বাড়ছে।
সম্প্রতি শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, চিকিৎসাধীন অনেক শিশুর হাতেই রয়েছে স্মার্টফোন। কেউ ভিডিও দেখছে, কেউ খেলছে অনলাইন গেম। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে অপেক্ষমাণ শিশুদের মধ্যেও একই চিত্র দেখা গেছে।
অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শহর এলাকায় খেলার মাঠের সংকট এবং ব্যস্ত জীবনযাপনের কারণে অনেক শিশু অবসর সময় ঘরের ভেতর মোবাইল ফোনেই কাটাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের খাওয়ানো কিংবা শান্ত রাখার উপায় হিসেবেও মোবাইল ব্যবহার করা হচ্ছে।
সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী শিশির দাস জানায়, স্কুল ও কোচিং শেষে তার বাইরে খেলাধুলার সুযোগ খুবই কম। তাই অবসর সময়ে ইউটিউব দেখা ও মোবাইল গেম খেলাই তার প্রধান বিনোদন। সম্প্রতি তার চোখে কিছু সমস্যা অনুভূত হচ্ছে বলেও জানায় সে।
অভিভাবক রাহিমা বেগম বলেন, তার ছেলে মোবাইল ছাড়া খেতে চায় না। এ কারণে বাধ্য হয়ে মোবাইল দিতে হয়। তবে এখন ধীরে ধীরে সেই অভ্যাস পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন তিনি।
আরেক অভিভাবক আকবর হোসেনের মতে, নগর এলাকায় শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার জায়গা না থাকায় অনেকেই মোবাইল নির্ভর হয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, সন্তানদের মোবাইল ব্যবহারের সময় সীমিত রাখার চেষ্টা করা প্রয়োজন।
শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, শিশু রোগীদের একটি বড় অংশের চোখের সমস্যার সঙ্গে মোবাইল আসক্তির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সানবিন ইসলাম বলেন, শিশুদের অতিরিক্ত মোবাইল নির্ভরতা কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি সামাজিকভাবেও প্রভাব ফেলতে পারে। পরিবারে পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া এবং খেলাধুলার সুযোগ কমে যাওয়াও এ সমস্যার গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. শফিকুল ইসলাম জানান, শহরাঞ্চলের শিশুদের মধ্যে মায়োপিয়ার হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। অনেক শিশুকে অল্প বয়সেই উচ্চক্ষমতার চশমা ব্যবহার করতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রাখার কারণে এই ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তিনি বলেন, শিশুকে ব্যস্ত রাখা বা খাওয়ানোর জন্য মোবাইল ফোন হাতে তুলে দেওয়া এখন সাধারণ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শিশুদের চোখের ওপর নেতিবাচকভাবে পড়ছে। তাই ছোটবেলা থেকেই মোবাইল ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের প্রতিদিন কিছু সময় খোলা পরিবেশে খেলাধুলা, শারীরিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং স্ক্রিন টাইম কমিয়ে আনার মাধ্যমে মায়োপিয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনার মতামত দিন।