সীমান্ত ঘিরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নানা ইস্যুতে উত্তেজনা ও আলোচনার মধ্যেও কুড়িগ্রামের একটি মসজিদ দুই দেশের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ব ও সহাবস্থানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ভূরুঙ্গামারী উপজেলার দক্ষিণ বাঁশজানী এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক ঝাকুয়াটারি মসজিদ স্থানীয়দের কাছে ‘সীমান্ত মসজিদ’ নামে পরিচিত। মসজিদটির একটি অংশ বাংলাদেশের ভেতরে হলেও অন্য অংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার গারোলঝোরা গ্রামের সীমানার মধ্যে পড়েছে। সীমান্ত পিলারের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদে প্রতিদিন দুই দেশের মুসল্লিরা একসঙ্গে নামাজ আদায় করেন।
শুক্রবার জুমার দিনে মসজিদ প্রাঙ্গণে দেখা যায় ভিন্ন এক আবহ। বাংলাদেশ ও ভারত থেকে আসা মুসল্লিরা একসঙ্গে নামাজে অংশ নেন, কুশল বিনিময় করেন এবং তবারক বিতরণ করেন। সীমান্তের কাঁটাতার যেন সেখানে কোনো বিভাজন তৈরি করতে পারেনি।
ভারতের বাসিন্দা আবু বক্কর বলেন, বহু বছর ধরে তারা এই মসজিদে নামাজ আদায় করছেন। দুই দেশের নাগরিক হলেও নিজেদের মধ্যে কখনো দূরত্ব অনুভব করেন না। ধর্মীয় এই মিলনস্থল তাদের পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছে।
মসজিদের ইমাম আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশক ধরে তিনি এখানে ইমামতি করছেন। তার ভাষায়, এই মসজিদ শুধু ইবাদতের স্থান নয়, বরং দুই দেশের মানুষের ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার প্রতীক। তিনি মসজিদের অবকাঠামোগত উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা কামনা করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৮২০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মসজিদটি। দেশভাগের পর সীমান্তরেখা দুই দেশের মধ্যে বিভাজন তৈরি করলেও মানুষের আত্মিক সম্পর্ক অটুট রয়েছে। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে দুই দেশের মুসল্লিরা একই কাতারে দাঁড়িয়ে ইবাদত করেন।
বহু পুরোনো হওয়ায় ২০২১ সালে মসজিদটি সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে আইনি জটিলতার কারণে সেই কাজ আর এগোয়নি। বর্তমানে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি দেখতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা আসেন।
লালমনিরহাট থেকে আসা দর্শনার্থী বেলাল হোসেন বলেন, মসজিদটির কথা অনেক শুনেছিলেন। সরেজমিনে দেখে তার মনে হয়েছে এটি দুই দেশের মানুষের মধ্যে শান্তি ও সম্প্রীতির এক জীবন্ত প্রতীক।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. শামিম বলেন, প্রতিদিনই অনেক মানুষ মসজিদটি দেখতে আসেন। প্রয়োজনীয় উন্নয়ন কাজ হলে এটি সীমান্ত অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থানে পরিণত হতে পারে।
ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমৃত দেব নাথ বলেন, মসজিদটির ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব রয়েছে। স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা করে এর উন্নয়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
সীমান্তের নানা উত্তেজনা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও ঝাকুয়াটারি সীমান্ত মসজিদ আজও দুই দেশের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও শান্তির বার্তা ছড়িয়ে যাচ্ছে।
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনার মতামত দিন।