রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলোর একাধিক ডিপো দীর্ঘদিন ধরে তেল চুরির কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েলের আওতাধীন দেশের ৫০টির বেশি ডিপো থেকে নানা কৌশলে বিপুল পরিমাণ তেল গায়েব হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন অভিযানে লাখ লাখ লিটার তেল উদ্ধার হওয়ায় বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ডিপোগুলোকে ঘিরে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এতে জড়িত রয়েছে কিছু অসাধু কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং প্রভাবশালী মহল। অভিযোগ রয়েছে, চুরি হওয়া তেল অনেক সময় সিস্টেম লস বা পরিবহন ক্ষতি হিসেবে দেখিয়ে হিসাব সমন্বয় করা হয়। ফলে মূল হোতারা বারবার আড়ালে থেকে যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম ও পার্বতীপুর ডিপোর চিত্র
দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপো থেকে একাধিকবার তেল গায়েবের ঘটনা ঘটলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নজির খুব কম। তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তি হয়নি। বরং কিছু কর্মচারীকে বদলি করে দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একাধিক ঘটনার পরও একই ডিপোতে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় সূত্র বলছে, ডিপোতে তেল কম বা বেশি দেখিয়ে হিসাব মিলিয়ে ফেলার প্রবণতা এখন সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
মোংলা ও অন্যান্য ডিপোতে অস্বাভাবিকতা
সম্প্রতি এক অভিযানে মোংলা ডিপোতে কাগজে থাকা হিসাবের চেয়ে অতিরিক্ত তেল পাওয়া যায়। এর কোনো ব্যাখ্যা দিতে না পারায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কখনো তেল কম দেখানো হয়, আবার কখনো বাড়তি পাওয়া যায়। এই অস্বাভাবিকতার পেছনে সুসংগঠিত কারসাজি রয়েছে।
পরিবহনের পথে চুরি
তেল চুরির বড় একটি অংশ ঘটে পরিবহনের সময়। একটি লড়িতে নির্ধারিত পরিমাণের বাইরে অতিরিক্ত তেল বহন করে মাঝপথে তা বিক্রি করে দেওয়া হয়। এছাড়া নদীপথে জাহাজ থেকে তেল নামানোর সময়ও চুরি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ ও আশপাশ এলাকায় প্রকাশ্যে অবৈধভাবে ডিজেল ও অকটেন বিক্রির চিত্রও দেখা গেছে।
জেট ফুয়েল চুরির বড় ঘটনা
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল থেকে রাজধানীর কুর্মিটোলা ডিপোতে যাওয়ার পথে বিপুল পরিমাণ জেট ফুয়েল নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কাগজে-কলমে তেল পৌঁছেছে দেখানো হলেও বাস্তবে তা গন্তব্যে যায়নি।
জানা গেছে, জেট ফুয়েল তুলনামূলক কম দামের হওয়ায় তা অকটেনের সঙ্গে মিশিয়ে বাজারে বিক্রি করা হয়।
খুলনায় তিনগুণ দামে বিক্রি
খুলনা অঞ্চলে ডিপো থেকে তেল সরিয়ে গ্রামাঞ্চলে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। পাম্প মালিকদের সঙ্গে যোগসাজশে এই সিন্ডিকেট কাজ করছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
সাম্প্রতিক সময়ে তেলের সংকটের সুযোগে কালোবাজারে বাড়তি দামে বিক্রি বেড়েছে। এতে সাধারণ ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান
কর্তৃপক্ষের দাবি, তেল সরবরাহে কঠোর নজরদারি রয়েছে এবং গোয়েন্দা সংস্থার পর্যবেক্ষণও চালু আছে। তবে বাস্তবে চোরাকারবার বন্ধ করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
বিশ্লেষণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে শাস্তির অভাব, অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা এবং প্রভাবশালী চক্রের কারণে তেল চুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে সংকট আরও বাড়তে পারে।