মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের নির্মাণসামগ্রীর বাজারে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট এবং পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে রড ও সিমেন্টের দাম দ্রুত বাড়ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি টন রডের দাম ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। একই সময়ে সিমেন্টের প্রতি বস্তায় ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে আবাসন খাতের উদ্যোক্তা ও সাধারণ নির্মাণকারীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে ভালো মানের রড প্রতি টন ৯৪ থেকে ৯৬ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে একই রডের দাম ছিল প্রায় ৮৫ থেকে ৮৬ হাজার টাকা।
তুলনামূলক কম পরিচিত ব্র্যান্ডের রডের দামও বেড়েছে। আগে এসব রড ৮১ থেকে ৮৩ হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি হলেও এখন তা প্রায় ৯০ হাজার টাকায় পৌঁছেছে।
রাজধানীর তেজতুরি বাজারের রড ব্যবসায়ী এসএস করপোরেশনের সহকারী মহাব্যবস্থাপক আবু সুফিয়ান জানান, গত এক মাস ধরে ধাপে ধাপে দাম বাড়ছিল। তবে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কোম্পানিগুলো এক সপ্তাহের মধ্যে টনপ্রতি কয়েক হাজার টাকা দাম বাড়িয়েছে।
তিনি বলেন, ডিজেল সংকটের কারণে ট্রাকভাড়া বেড়ে যাওয়ায় খুচরা পর্যায়ে দাম আরও বাড়ছে।
সিমেন্টের বাজারেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন স্থিতিশীল থাকার পর বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিমেন্টের বস্তাপ্রতি দাম বেড়ে এখন ৫০০ থেকে ৫১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দুই সপ্তাহ আগেও এই দাম ছিল ৪৮০ থেকে ৪৯০ টাকার মধ্যে।
পূর্ব তেজতুরি বাজারের সিমেন্ট ব্যবসায়ী নুর উদ্দিন আহমেদ বলেন, যুদ্ধের প্রভাব দেখিয়ে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বস্তাপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে।
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ড. সুমন চৌধুরী বলেন, বৈশ্বিক বাজারে রড তৈরির প্রধান কাঁচামাল স্ক্র্যাপের দাম গত দুই সপ্তাহে প্রতি টনে ৫০ থেকে ৬০ ডলার পর্যন্ত বেড়েছে।
তিনি জানান, জাহাজভাড়া বৃদ্ধি, দেশে ডিজেল সংকট এবং গ্যাস সরবরাহের ঘাটতির কারণে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। অনেক কারখানায় গ্যাসের অভাবে উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।
অন্যদিকে সিমেন্ট খাতের উদ্যোক্তারা জানান, সিমেন্ট উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় ক্লিংকার, জিপসাম, স্ল্যাগ, চুনাপাথর ও ফ্লাই অ্যাশ এসব কাঁচামালের বেশিরভাগই আমদানিনির্ভর। সম্প্রতি এসব কাঁচামালের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যও বেড়েছে।
ডায়মন্ড সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল খালেক বলেন, কাঁচামালের দাম বাড়ার পাশাপাশি গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাজারদরে।
এদিকে জ্বালানি তেলের রেশনিং ও পাম্পে দীর্ঘ লাইনের কারণে পরিবহন খাতেও চাপ তৈরি হয়েছে। তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডের পরিবহন মালিক আলমগীর হোসাইন বলেন, ডিজেল সংগ্রহে সময় বেশি লাগায় চালকদের অতিরিক্ত পারিশ্রমিক দিতে হচ্ছে, ফলে ভাড়া বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই।
নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়ায় আবাসন খাতেও প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। REHAB–এর সিনিয়র সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া বলেন, নির্মাণ ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় অনেক প্রকল্প ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
তার মতে, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ফ্ল্যাটের দাম বাড়তে পারে এবং অনেক ব্যক্তি বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা স্থগিত করতে পারেন। পাশাপাশি সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি বলেন, বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা যাচাই করতে সরকার ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে একটি তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
এখনো কোনো মতামত নেই।