ঈদুল ফিতরের আগে দেশের অন্তত ১৮০টি তৈরি পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের বেতন ও উৎসব বোনাস পরিশোধে জটিলতা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার শ্রমিকের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষ প্রতিবেদনে এ আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সম্প্রতি প্রতিবেদনটি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং পুলিশের মহাপরিদর্শকের কাছে পাঠানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধ না হলে ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা সড়ক অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে নামতে পারেন। একটি কারখানায় অসন্তোষ দেখা দিলে আশপাশের অন্য কারখানার শ্রমিকরাও আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা দ্রুত শিল্পাঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এতে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরও প্রভাব পড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কয়েকটি শ্রমিক সংগঠনের কিছু নেতার কার্যক্রমের ওপর নজরদারি বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র ও গার্মেন্টস শ্রমিক অধিকার আন্দোলনের কিছু নেতার কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ।
একই সঙ্গে যেসব কারখানা ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস দিতে পারবে না, তাদের জন্য সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে স্বল্পমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
ঈদ উপলক্ষে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধের জন্য সরকার ১২ মার্চ পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ করেছিল। তবে শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময় শেষ হওয়া পর্যন্ত মাত্র ২২ শতাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধ করা হয়েছে।
এদিকে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে মার্চ মাসের অর্ধেক অগ্রিম বেতন দেওয়ার দাবিও এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যেসব কারখানায় বেতন-বোনাস পরিশোধে সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের মালিকদের রাজনৈতিক অবস্থানও পর্যালোচনা করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, প্রায় ১৯ শতাংশ পোশাক কারখানার মালিক আওয়ামী লীগপন্থি ব্যবসায়ী। সরকার পরিবর্তনের পর তাদের অনেকেই পলাতক বা আত্মগোপনে থাকায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে আর্থিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।
এছাড়া কিছু নিবন্ধনহীন কারখানার মালিক বেতন-বোনাস না দিয়েই প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে পালিয়ে যেতে পারেন বলেও প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে শ্রমিকরা বকেয়া পাওনার দাবিতে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কিংবা সড়ক অবরোধের মতো কর্মসূচি নিতে পারেন। এমনকি ঈদের আগে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, সচিবালয়, শাহবাগ, জাতীয় প্রেস ক্লাব, শ্রম ভবন ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় শ্রমিক সমাবেশ হওয়ার আশঙ্কাও তুলে ধরা হয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রতিবেদনে কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মালিক, শ্রমিক ও সরকারের প্রতিনিধিদের নিয়ে ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান, শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন-বোনাস ও মার্চ মাসের অগ্রিম বেতন পরিশোধ নিশ্চিত করা এবং সাব-কন্ট্রাক্ট বা ছোট কারখানাগুলোর ওপর নজরদারি জোরদার করা।
এদিকে বেতন-বোনাসের দাবিতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। ময়মনসিংহের ভালুকা ও ত্রিশাল, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, কুমিল্লার চান্দিনা এবং রাজধানীর মিরপুরে বুধবার ও বৃহস্পতিবার শ্রমিকরা বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেন। এতে কয়েকটি সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
শিল্প পুলিশের গাজীপুর অঞ্চলের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে অনেক কারখানায় বেতন-বোনাস দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে রোববার ও সোমবারের মধ্যে অধিকাংশ কারখানায় শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অন্যদিকে শিল্প পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি গাজী জসীম উদ্দীন বলেন, কিছুটা অস্থিরতার আশঙ্কা থাকলেও পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সরকার, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সমন্বয়ে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধের উদ্যোগ চলছে।
এখনো কোনো মতামত নেই।