কক্সবাজারে টানা বর্ষণ ও অব্যাহত পাহাড় কাটার কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। পরিবেশবাদীদের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৮ জুলাই পর্যন্ত গত ১৮ বছরে পাহাড়ধসে প্রাণ হারিয়েছেন ৩১২ জন।
পরিবেশ সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব, ভূমিদস্যু চক্রের তৎপরতা এবং পর্যাপ্ত পুনর্বাসনের অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসতি নির্মাণ বন্ধ করা যাচ্ছে না। ফলে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।
বর্তমানে কক্সবাজারের পাহাড়তলী, বাদশাঘোনা, ছাত্তারঘোনা, খাজা মঞ্জিল, লারপাড়া ও টেকনাইফ্যা পাহাড়সহ বিভিন্ন এলাকায় ধসের আশঙ্কা বেড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভারী বৃষ্টির সময় পাহাড়ে ফাটলের শব্দ তাদের আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে তোলে। ঝুঁকির বিষয়টি জানা থাকলেও বিকল্প আশ্রয়ের অভাবে অনেকেই পাহাড় ছেড়ে যেতে পারছেন না।
শুধু গত এক সপ্তাহেই জেলার বিভিন্ন পাহাড়ে চার শতাধিক ভূমিধসের ঘটনায় পাঁচ মাদ্রাসাছাত্রীসহ অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় সূত্র বলছে, জেলার বিভিন্ন পাহাড়ে বর্তমানে প্রায় তিন লাখ মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করছেন।
প্রতি বর্ষা মৌসুমে প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষ সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিলেও পরিস্থিতিরবৃষ্টি-বন্যার প্রভাবে রাজধানীতে সবজি ও মাছের দাম ঊর্ধ্বমুখী, টমেটো ১৩০ টাকা কেজি স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। বৃষ্টি কমে গেলে আবারও শুরু হয় পাহাড় কাটা ও নতুন বসতি নির্মাণ। পরিবেশবাদীদের দাবি, দরিদ্র মানুষের অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে প্রভাবশালী চক্র পাহাড়ি জমি দখল ও বিক্রি করছে।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানিয়েছেন, পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়া পাহাড়ের বসতি স্থায়ীভাবে উচ্ছেদ করা কঠিন। তবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষ সরিয়ে নেওয়ার কাজ অব্যাহত রয়েছে। গত তিন দিনে অন্তত পাঁচ হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তর করা হয়েছে।
পরিবেশবিষয়ক সংগঠন এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস)-এর জরিপে দেখা গেছে, পাহাড়ধসে নিহত ৩১২ জনের মধ্যে ৫৪ জন রোহিঙ্গা। সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে ২০১০ সালের ১৫ জুন, যখন একদিনেই ৬২ জন প্রাণ হারান।
পরিবেশবাদীদের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার পৌরসভার পাঁচটি ওয়ার্ডের ৫১টি পাহাড়ে গত তিন দশকে ২২ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। এসব এলাকায় দুই লাখেরও বেশি মানুষ বসবাস করছেন, যাদের বড় অংশ নিম্নআয়ের শ্রমজীবী ও জলবায়ুজনিত কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষ।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি করিম উল্লাহ বলেন, পাহাড় কাটার ফলে বনভূমি ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। পাশাপাশি পাহাড়ের পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় পাহাড়ধস ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বাড়ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সাল থেকে পাহাড় দখল ও কাটার অভিযোগে ৫০০-এর বেশি দখলদারের বিরুদ্ধে ৩৪০টি মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২২০টি মামলা পাহাড় নিধনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। একই সময়ে বন বিভাগও পাহাড় কাটার অভিযোগে শত শত মামলা করেছে। তবে জনবল ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে পাহাড় ধ্বংস পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনার মতামত দিন।