কক্সবাজার শহর ও আশপাশের ৫১টি পাহাড়ে প্রায় ২২ হাজার অবৈধ বসতি গড়ে উঠেছে। এসব ঝুঁকিপূর্ণ বসতিতে কয়েক লাখ মানুষ বসবাস করছেন। চলতি সপ্তাহের টানা ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ধসে ২২ জনের মৃত্যু হওয়ায় আবারও সামনে এসেছে পাহাড় দখল ও অবৈধ বসতির ভয়াবহ বাস্তবতা।
পরিবেশবাদীদের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৮ জুলাই পর্যন্ত গত ১৮ বছরে কক্সবাজারে পাহাড়ধসে ৩১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ৫৪ জন রোহিঙ্গা। সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে ২০১০ সালের ১৫ জুন, যখন একদিনেই প্রাণ হারান ৬২ জন।
প্রায় তিন লাখ মানুষ ঝুঁকিতে
টানা বর্ষণে পাহাড়তলী, বাদশাঘোনা, ছাত্তারঘোনা, খাজা মঞ্জিল, লারপাড়া ও টেকনাইফ্যা পাহাড়সহ বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, বর্তমানে জেলার বিভিন্ন পাহাড়ে প্রায় তিন লাখ মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করছেন। শুধু গত এক সপ্তাহেই চার শতাধিক ভূমিধসের ঘটনায় পাঁচ মাদ্রাসাছাত্রীসহ অন্তত ২২ জন নিহত হয়েছেন।
পুনর্বাসনের অভাবে ছাড়তে পারছেন না পাহাড়
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভারী বৃষ্টির সময় পাহাড়ে ফাটলের শব্দ শুনেই আতঙ্কে রাত কাটাতে হয়। ঝুঁকির বিষয়টি জানলেও বিকল্প আশ্রয়ের অভাবে অনেকেই পাহাড় ছাড়তে পারছেন না।
প্রতি বর্ষায় প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষ সরিয়ে নিলেও বৃষ্টি কমে গেলে আবার শুরু হয় পাহাড় কেটে নতুন বসতি নির্মাণ।
ভূমিদস্যু ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, ভূমিদস্যু চক্র দরিদ্র মানুষের অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে পাহাড় দখল ও বিক্রি করছে। রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বিভিন্ন সিন্ডিকেট অবৈধভাবে পাহাড় কেটে নতুন বসতি তৈরি করছে।
পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাদশাঘোনা এলাকায় ৭০ থেকে ৮০ ফুট উঁচু একটি পাহাড়ের ঢাল, চূড়া ও পাদদেশে প্রায় ৬০০টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। সম্প্রতি সেখানে নতুন করে পাহাড় কাটারও প্রমাণ মিলেছে।
প্রশাসনের বক্তব্য
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, বিকল্প পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়া পাহাড়ের অবৈধ বসতি স্থায়ীভাবে উচ্ছেদ করা কঠিন। তবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষ সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে এবং গত তিন দিনে অন্তত পাঁচ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা হয়েছে।
পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি করিম উল্লাহ বলেন, পাহাড় কাটার কারণে শুধু বন ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে না, পাহাড়ের পানি ধারণক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। ফলে পাহাড়ধসের পাশাপাশি শহরে জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বাড়ছে।
শত শত মামলা, তবুও থামছে না পাহাড় কাটা
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সাল থেকে পাহাড় দখল ও কাটার অভিযোগে ৫০০-এর বেশি দখলদারের বিরুদ্ধে ৩৪০টি মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২২০টি মামলা পাহাড় নিধনের।
এদিকে বন বিভাগও গত এক বছরে ৩০৪টি মামলা করেছে। তবে জনবল ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে পাহাড় দখল ও অবৈধভাবে পাহাড় কাটা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনার মতামত দিন।