বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব ও নকআউট রাউন্ড মিলিয়ে টানা ২৮ দিনের উত্তেজনাপূর্ণ লড়াই শেষে শুরু হচ্ছে শেষ আটের মহারণ। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) মাঠে গড়াচ্ছে কোয়ার্টার ফাইনাল। তবে টুর্নামেন্ট নতুন ধাপে প্রবেশ করলেও থামছে না আর্জেন্টিনা মিসর ম্যাচকে ঘিরে বিতর্ক।
শেষ ষোলোর সেই বহুল আলোচিত ম্যাচে রেফারির কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে এখনও আলোচনা চলছে। ম্যাচ শেষে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মিসরের প্রধান কোচ হোসাম হাসান এবং দলের স্ট্রাইকার মোস্তফা জিকো। তাদের অভিযোগ, ম্যাচ পরিচালনায় আর্জেন্টিনা বাড়তি সুবিধা পেয়েছে। এমনকি ম্যাচটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল বলেও দাবি করেন তারা।
তবে মিসর শিবিরের এসব অভিযোগকে গুরুত্ব দিচ্ছে না ফিফা। সংস্থাটির প্রধান রেফারিং কর্মকর্তা পিয়ারলুইজি কলিনা স্পষ্ট জানিয়েছেন, রেফারিং নিয়ে ওঠা অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই এবং অযথা বিতর্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে।
ইনসাইড ফিফা ডটকমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আর্জেন্টিনা–মিসর ম্যাচের বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন অভিজ্ঞ এই রেফারি। সবকিছু পর্যালোচনা করে তিনি বলেন, ম্যাচ পরিচালনায় রেফারির কোনো ভুল ছিল না।
মিসরের আপত্তির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দুটি সিদ্ধান্ত। প্রথম ঘটনায় ভিএআর পর্যালোচনার পর আগের একটি ফাউলের কারণে মিসরের করা গোল বাতিল করা হয়। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার জয়সূচক তৃতীয় গোলের আগে ফাউলের অভিযোগ থাকলেও সেটি ভিএআরে দেখা হয়নি বলে দাবি করে মিসর।
ম্যাচের ৫৮ মিনিটে পাল্টা আক্রমণ থেকে গোল করেন মোস্তফা জিকো। তবে আক্রমণের সূচনায় মিসরের এক ফুটবলার আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে ফাউল করেছিলেন। গোল হওয়ার প্রায় ৮৫ মিটার আগে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনাটি ভিএআরে ধরা পড়লে রেফারি গোলটি বাতিল করেন।
অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ের পর যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজ জয়সূচক গোল করেন। আক্রমণের শুরুতে আর্জেন্টিনার ডি-বক্সে হুলিয়ান আলভারেজের সঙ্গে সংস্পর্শে পড়ে যান মোহামেদ সালাহ। তবে রেফারি সেটিকে ফাউল হিসেবে দেখেননি।
এ দুটি সিদ্ধান্ত নিয়েই ব্যাখ্যা দিয়েছেন কলিনা।
তিনি বলেন, “প্রতিটি গোলের পর ভিএআর আক্রমণাত্মক বল দখলের পুরো পর্যায় (Attacking Possession Phase) পর্যালোচনা করে। গোল হওয়ার আগে কোনো ফাউল শনাক্ত হলে এবং সেটি গোলের ওপর প্রভাব ফেলেছে বলে মনে হলে ভিএআর মাঠের রেফারিকে ভিডিও পুনরায় দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেয়।”
তিনি আরও বলেন, “গোল থেকে দূরত্ব বা ফাউল এবং গোলের মধ্যকার সময়ের কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। একটি ফাউল মানেই ফাউল। রেফারি যদি মাঠে সেটি দেখতে না পান, তাহলে ভিএআর হস্তক্ষেপ করতে পারে।”
কলিনার ভাষ্য, “যদি গোল হওয়ার আগে কোনো ফাউল শনাক্ত না হয়, তবে ভিএআর সেই তথ্যই রেফারিকে জানায়। প্রতিপক্ষের পায়ের ওপর পা রাখা অবশ্যই ফাউল। তবে ডিফেন্ডার যদি আগে বল স্পর্শ করেন এবং পরে স্বাভাবিক ফুটবলীয় সংস্পর্শ হয়, তাহলে সেটিকে ফাউল ধরা হয় না।”
তিনি বলেন, “এই ম্যাচের শেষ দিকে মোহামেদ সালাহ ও হুলিয়ান আলভারেজের মধ্যকার ঘটনাটিকেও রেফারি এবং ভিএআর স্বাভাবিক ফুটবলীয় সংস্পর্শ হিসেবেই বিবেচনা করেছেন।”
পাঁচবারের আন্তর্জাতিক বর্ষসেরা রেফারি নির্বাচিত হওয়া কলিনা রেফারিদের প্রতি সহনশীল হওয়ার আহ্বানও জানান। তার মতে, ভিত্তিহীন অভিযোগ অনেক সময় রেফারি ও তাদের পরিবারের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তিনি বলেন, “সিদ্ধান্ত নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা ফুটবলের অংশ। কিন্তু ভিত্তিহীন অভিযোগের কোনো জায়গা নেই। বিশ্বকাপের রেফারিদের সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলা উচিত নয়। এমন অভিযোগ রেফারি এবং তাদের পরিবারের জন্যও বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।”
এ সময় তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, ম্যাচ পরিচালনায় ফিফা প্রেসিডেন্টেরও কোনো ধরনের প্রভাব থাকে না।
কলিনার ভাষায়, “কেউ বলতে পারে না যে ফিফা রেফারিং ব্যবস্থার ওপর কারও প্রভাব রয়েছে, এমনকি ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোরও নয়। তিনি সবসময় ‘ফিফা টিম ওয়ান’-এর প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখেছেন এবং আমাদের সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিয়েছেন। ম্যাচ পরিচালনাকারীরা সৎভাবে সিদ্ধান্ত নেন এবং খেলোয়াড় ও কোচদের মতো তারাও সবসময় নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেন।”
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনার মতামত দিন।