দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপের আর্থিক সংকটকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ব্যাংকগুলোর ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া। ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের সুনামের ওপর নির্ভর করে বিপুল পরিমাণ ঋণ অনুমোদন দেওয়া হলেও প্রকল্পভিত্তিক ঝুঁকি যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত সিটি গ্রুপের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা। দেশি ও বিদেশি মিলিয়ে ৪৮টি ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে ২০২০ সালের পর কয়েকটি বৃহৎ শিল্পপ্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে সিটি গ্রুপ। তবে প্রত্যাশিত সময়ে গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় এসব প্রকল্প পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে বিনিয়োগের বিপরীতে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব প্রবাহ তৈরি না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক চাপে পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত হবে কিনা, সে ঝুঁকি আরও গভীরভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন ছিল। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের অতীত সাফল্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সিটি গ্রুপে সবচেয়ে বেশি ঋণ রয়েছে এইচএসবিসি ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের। এছাড়া দেশের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংকও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থায়ন করেছে।
ঋণ পরিশোধে চাপ বাড়তে থাকায় সম্প্রতি সিটি গ্রুপ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নীতিগত সহায়তা চেয়ে আবেদন করে। আবেদনে প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখ করে, গত পাঁচ দশকে কখনো ঋণ খেলাপি না হলেও সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপে তাদের কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে গত ১৮ জুন দেশের ও বিদেশি বিভিন্ন ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা সিটি গ্রুপের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে প্রায় ২৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠনের বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয় ৩৬টি ব্যাংক। এ লক্ষ্যে একটি বিশেষ কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিন বলেন, সিটি গ্রুপের বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে হাজার হাজার কর্মসংস্থান, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং দেশের বৃহৎ শিল্পখাত জড়িত।
অন্যদিকে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান মনে করেন, ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে গ্রাহকের সুনামের পাশাপাশি আর্থিক সক্ষমতা, নগদ প্রবাহ, সুশাসন এবং সংশ্লিষ্ট খাতের ঝুঁকি আরও কঠোরভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্পায়নের সম্ভাবনা বিবেচনায় ব্যাংকগুলো অর্থায়ন করেছিল। তবে অবকাঠামোগত ও জ্বালানি সহায়তা সময়মতো না পাওয়ায় প্রকল্পগুলো প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী মো. এনামুল হক বলেন, ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি, পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন বাহ্যিক কারণে সিটি গ্রুপের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। ব্যাংকটি বর্তমানে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করছে।
সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান বলেন, অর্থায়নের বিকল্প উৎস সীমিত থাকায় একাধিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। পাশাপাশি গ্যাস সংযোগ না পাওয়া, উচ্চ সুদহার এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা প্রতিষ্ঠানটির সংকটকে আরও গভীর করেছে।
দেশের ভোগ্যপণ্য খাতের অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান হিসেবে সিটি গ্রুপ বর্তমানে ভোজ্যতেল, চিনি, আটা, খাদ্যপণ্য, জাহাজ নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা ও আর্থিক খাতসহ বিভিন্ন ব্যবসায় জড়িত। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা এবং সরাসরি কর্মসংস্থান রয়েছে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের।
ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সিটি গ্রুপের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে বড় করপোরেট অর্থায়নের ক্ষেত্রে ঝুঁকি মূল্যায়ন, প্রকল্প যাচাই এবং আন্তঃব্যাংক সমন্বয় আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা সামনে নিয়ে এসেছে।
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনার মতামত দিন।