বিশ্বকাপের মঞ্চে সব গল্প শুধু জয়-পরাজয়ের নয়। কিছু গল্প থাকে সংগ্রাম, ত্যাগ আর অদম্য মানসিক শক্তির। ইরাকের স্ট্রাইকার আয়মান হুসেইনের গল্পও তেমনই।
বুধবার ভোরে নরওয়ের বিপক্ষে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে ৪-১ ব্যবধানে হেরেছে ইরাক। তবে পরাজয়ের মধ্যেও আলো কেড়েছেন ৩০ বছর বয়সী হুসেইন। দলের একমাত্র গোলটি করে তিনি আবারও প্রমাণ করেছেন কেন তাকে ইরাকের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ফরোয়ার্ড বলা হয়।
ম্যাচ শেষে ইরাকের প্রধান কোচ গ্রাহাম আর্নল্ড তার প্রশংসা করে বলেন, হুসেইন এমন একজন ফুটবলার যাকে বক্সের ভেতরে সামলানো খুবই কঠিন। তার পারফরম্যান্সে আমি গর্বিত।
তবে মাঠের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। যুদ্ধ, সহিংসতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় জর্জরিত এক ইরাকে বেড়ে উঠেছেন হুসেইন। সেই সময় ফুটবল ছিল দেশটির মানুষের জন্য আশার প্রতীক।
মাত্র ১২ বছর বয়সে জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা পান তিনি। ২০০৮ সালে তার বাবা, যিনি ইরাকি সেনাবাহিনীর সদস্য ছিলেন, বাজারে নির্মাণসামগ্রী কিনতে গিয়ে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন। কয়েক বছর পর অপহরণের শিকার হন তার বড় ভাই। আজও তার কোনো খোঁজ মেলেনি।
এত বড় দুই ট্র্যাজেডির পর একসময় ফুটবল ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন হুসেইন। পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তার মা তাকে স্বপ্ন ছেড়ে দিতে দেননি।
এক সাক্ষাৎকারে হুসেইন বলেন, আমি ফুটবল ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু মা আমাকে বুঝিয়েছিলেন, স্বপ্নের পেছনে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।
মায়ের সেই অনুপ্রেরণাই বদলে দেয় তার জীবন। জাতীয় দলের জার্সিতে অভিষেকের পর ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন ইরাকের আক্রমণভাগের মূল ভরসা। এখন পর্যন্ত দেশের হয়ে ৩৪টি আন্তর্জাতিক গোল করেছেন তিনি।
বিশ্বকাপে ওঠার পথেও ছিল তার বড় অবদান। বাছাইপর্ব ও প্লে-অফ মিলিয়ে করেছেন ১২ গোল। মার্চে বলিভিয়ার বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ জয়সূচক গোল করে ইরাকের বিশ্বকাপ নিশ্চিত করার নায়কও ছিলেন তিনিই।
বিশ্বকাপের আগে আরও এক কঠিন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় তাকে। যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর শিকাগোর ও’হেয়ার বিমানবন্দরে প্রায় সাত ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়েন হুসেইন। তবে সব বিতর্কের জবাব তিনি দিয়েছেন মাঠে।
নরওয়ের বিপক্ষে দুর্দান্ত এক হেডে গোল করে বিশ্বকাপে নিজের ছাপ রেখে দিয়েছেন এই স্ট্রাইকার। দল হারলেও তার পারফরম্যান্স ফুটবলপ্রেমীদের নজর কেড়েছে।
গ্রুপে এখনও ফ্রান্স ও সেনেগালের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষ বাকি। তবে হুসেইন যদি এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেন, তাহলে ইরাকের নকআউট পর্বে যাওয়ার স্বপ্ন এখনো বেঁচে থাকবে।
যুদ্ধ, শোক আর প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে বিশ্বকাপের আলোয় উঠে আসা আয়মান হুসেইন এখন শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি হয়ে উঠেছেন অদম্য মানসিক শক্তির প্রতীক।
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনার মতামত দিন।