চাঁদে দুই ঘণ্টা ঘুরে বেড়াল হাতের তালুর সমান খুদে রোভার
মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে সাধারণত বড় আকারের রোভার ও ভারী যন্ত্রপাতির কথাই বেশি শোনা যায়। তবে প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে এখন হাতের তালুর সমান ছোট রোভারও সফলভাবে চাঁদের মাটিতে কাজ করতে পারছে। এমনই একটি ক্ষুদ্র রোভার ২০২৪ সালে চাঁদে পাঠিয়েছিল জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা জাক্সা (JAXA)।
সম্প্রতি Science Robotics সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে, কীভাবে এলইভি-২ (LEV-2) নামের এই ছোট রোভারটি মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই চাঁদের বুকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলাচল করেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করেছে।
চাঁদে সফল স্বয়ংক্রিয় অভিযান
জাপানের চন্দ্রযান স্লিম (SLIM) ল্যান্ডারের সঙ্গে পাঠানো হয়েছিল এলইভি-২ রোভারটিকে। চাঁদের মাটিতে অবতরণের পর রোভারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আশপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণ করে এবং প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে বিভিন্ন স্থানে চলাচল করে।
এই সময়ের মধ্যে রোভারটি স্লিম ল্যান্ডারের চারপাশের পরিবেশ বিশ্লেষণ করেছে, উচ্চমানের ছবি তুলেছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পুরো মিশন পরিচালনার জন্য পৃথিবী থেকে সরাসরি কোনো নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয়নি।
ছোট রোভারের বড় চ্যালেঞ্জ
চাঁদের মাটি মূলত সূক্ষ্ম ও আলগা ধূলিকণায় আবৃত, যাকে রেগোলিথ বলা হয়। এই ধরনের পরিবেশে ছোট আকারের রোভারের চলাচল সহজ নয়। আকার ছোট হওয়ায় এর চাকা সহজেই মাটিতে আটকে যেতে পারে।
এ ছাড়া সীমিত জায়গার কারণে বড় ব্যাটারি কিংবা শক্তিশালী কম্পিউটার প্রসেসর ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। ফলে কম শক্তি ব্যবহার করে রোভারকে নিজেই পরিবেশ বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
কীভাবে পৃথিবীতে তথ্য পাঠিয়েছে?
শক্তি সাশ্রয়ের জন্য এলইভি-২ সরাসরি পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। পরিবর্তে এটি সংগ্রহ করা ছবি ও বৈজ্ঞানিক তথ্য কাছাকাছি অবস্থান করা সঙ্গী যান এলইভি-১-এর কাছে পাঠিয়েছে।
এরপর এলইভি-১ সেই তথ্য ও ছবিগুলো পৃথিবীর মিশন কন্ট্রোল সেন্টারে পাঠিয়ে দেয়। এই পদ্ধতির মাধ্যমে সীমিত শক্তি ব্যবহার করেও কার্যকর যোগাযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।
১০৮ মিনিটেই দেখিয়েছে সক্ষমতা
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে এলইভি-২ প্রায় ১০৮ মিনিট সক্রিয় ছিল। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই এটি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ হাই-রেজোলিউশন ছবি ধারণ করে এবং সফলভাবে পৃথিবীতে পাঠাতে সক্ষম হয়।
রোভারটির পাঠানো ছবিগুলো শুধু স্লিম ল্যান্ডারের অবস্থা পর্যবেক্ষণেই সহায়তা করেনি, বরং ক্ষুদ্রাকৃতির মহাকাশ রোবোটিকস প্রযুক্তির বাস্তব কার্যকারিতাও প্রমাণ করেছে।
মহাকাশ গবেষণার ভবিষ্যৎ
বিজ্ঞানীদের মতে, ছোট রোভার ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো কম খরচ, কম ওজন এবং সহজ পরিবহন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে একাধিক ক্ষুদ্র রোভার একসঙ্গে পাঠিয়ে বৃহৎ এলাকা অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এলইভি-২-এর সফল অভিযান প্রমাণ করেছে, সীমিত আকার ও শক্তি নিয়েও স্বয়ংক্রিয় মহাকাশ অনুসন্ধান সম্ভব। ফলে ভবিষ্যতের চন্দ্র ও গ্রহ অভিযানে ক্ষুদ্র রোবটভিত্তিক প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়তে পারে।
এই সাফল্য মহাকাশ গবেষণায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে এবং দেখিয়েছে যে ছোট প্রযুক্তিও বড় অর্জনের পথ তৈরি করতে পারে।
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনার মতামত দিন।